ভারতে আশ্রয় নেওয়া ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে দিল্লিকে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। ভারত সরকার বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পর্যালোচনায় ভারতের সম্মত হওয়া ইঙ্গিত দিতে পারে যে, গভীরভাবে বিভাজিত রাজনৈতিক ইস্যুতে কিছুটা নমনীয়তা এসেছে। তবে পর্যবেক্ষকেরা সতর্ক করেছেন, এর অর্থ এই নয় যে—নয়াদিল্লি এখনই সাবেক বাংলাদেশি এই শাসককে হস্তান্তরে প্রস্তুত।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে গণ–আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে ভারতে চলে যান। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ১৭ এপ্রিল নিশ্চিত করেছে যে, তারা ঢাকার প্রত্যর্পণ অনুরোধটি আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনা করছে।
এই ঘোষণা ভারতের আগের অবস্থান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এটি এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এল, যখন দিল্লি আইনি দায়বদ্ধতা ও ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে। গত ৮ এপ্রিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন।
ভারতের দিল্লির ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অভিনব মেহরোত্রা বলেন, ভারতের ‘সক্রিয়ভাবে পর্যালোচনা’ করার দাবির বিষয়টি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হলেও এটি এখনো প্রক্রিয়াগত ভাষা।
তিনি বলেন, সরকারগুলো প্রায়ই এই ধরনের ভাষা ব্যবহার করে কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়ে উন্মুক্ত মনোভাবের ইঙ্গিত দিতে। সরাসরি উপেক্ষা বা প্রত্যাখ্যানের তুলনায় এটি কিছুটা নমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। তবে এর মানে এই নয় যে ভারত তাকে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত।
শেখ হাসিনার নির্বাসন ঘটে একটি সহিংস গণ-অভ্যুত্থান ও ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের পর। উচ্চ যুব বেকারত্ব ও কথিত অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এই আন্দোলনের জ্বালানি জুগিয়েছিল, যা তার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়। গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ভারত ঐতিহাসিকভাবে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি এমন ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণ এড়িয়ে চলে, অনেক সময় মানবিক কারণ উল্লেখ করে।
ভারত ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে হাসিনাকে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখেছে। তিনি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ—বিশেষ করে ইসলামপন্থি চরমপন্থা ও আঞ্চলিক সংযোগ—সমাধানে ভূমিকা রেখেছিলেন।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ আইনি নয়, বরং রাজনৈতিক ইস্যু বলেই মনে করেন সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের গবেষণা ফেলো অমিত রঞ্জন। তার মতে, বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত।
তিনি বলেন, ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া ‘স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে ভারত দুই দেশের কিছু রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে চায়।’
এই নিয়োগ পেশাদার কূটনীতিকদের বদলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিয়োগের এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি, ভারতে তার আশ্রয় নেওয়া, বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ভারতবিরোধী মনোভাব এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঐতিহাসিক নিম্নস্তরে নেমে আসে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গৃহীত নীতি ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েনে ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা এবং বাংলাদেশে চীনা সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের আমন্ত্রণ। ড. ইউনূস ভারতকে ‘শেখ হাসিনাকে সমর্থন ও আশ্রয় দেওয়ার’ জন্য সমালোচনা করে বলেন, ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিপ্লব ভারত ‘পছন্দ করেনি’, যার কারণে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপির ভূমিধস জয়ের পর উভয় দেশ সম্পর্ক মেরামতের পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ধাপে ধাপে ভিসা সেবা পুনরায় চালু করা এবং এ মাসে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা।
গোয়ার মন্ত্রায়া ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট শান্থি ম্যারিয়েট ডি’সুজা বলেন, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হচ্ছে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা। এই লক্ষ্য পূরণে শেখ হাসিনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে ঢাকার কাছে সমর্পণ করা মানে কার্যত আওয়ামী লীগের অবসান।
ভারত নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী হলেও, ঢাকার পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক রয়েছে। ডি’সুজা বলেন, ঢাকা যদি আবার ভারতবিরোধী অবস্থানে ফিরে যায়, তখন চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সব সময়ই দিল্লির জন্য একটি কৌশলগত সম্পদ হয়ে থাকবেন।
শেখ হাসিনা ১৯৮১ সাল থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন এবং তার নেতৃত্বে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা ক্ষমতায় ছিল দলটি।
অভিনব মেহরোত্রা বলেন, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগোলে বাংলাদেশ ভারতের এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট ১৯৬২-এর অধীনে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠাবে। এটি পলাতকদের হস্তান্তর সংক্রান্ত ভারতীয় আইন। এরপর, দিল্লি অনুরোধটি পর্যালোচনা করার পর, আদালত দেখবে আইনি ভিত্তি আছে কি না। শেখ হাসিনা আদালতে এই অনুরোধকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন।
মেহরোত্রা বলেন, আদালত সম্মত হলেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক, এবং ভারত সরকার তখনো প্রত্যর্পণ অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে।


